May 25, 2026, 9:25 pm
মালিকের ইচ্ছায় নয়, নিয়ম অনুযায়ী পাঁচ বছর পরপর পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর কথা। সেই ধারাবাহিকতায় মজুরি বাড়ানোর আলোচনা চলছে। এ সংক্রান্ত সভা আগামী ২২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে। সভায় শ্রমিকদের পক্ষের প্রতিনিধি ন্যূনতম মজুরি ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করবেন। তবে, মালিক পক্ষ চাচ্ছেন নামমাত্র মজুরি বাড়াতে। অন্যদিকে, মজুরি বোর্ড সাড়ে ১৭ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেবে— সংশ্লিষ্ট সূত্রে এমন তথ্য জানা গেছে।
শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি কত হবে— এ নিয়ে আলোচনা চলছে বেশ কিছুদিন ধরে। শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব করা ২৫ সংগঠনের নেতারা ২০ হাজার টাকা বেশি রাখার প্রস্তাব করলেও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং কোনোভাবে জীবন চালিয়ে নিতে মজুরি ২৩ থেকে ২৫ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করে। সেই প্রস্তাব লিখিত আকারে জমা দেন তারা।
শ্রমিকদের বিষয়ে কাজ করা বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) শ্রমিকদের জীবন-মান মূল্যায়ন করে ন্যূনতম বেতন ১৭ হাজার ৫৬৫ টাকা করার প্রস্তাব করেছে। শ্রমিকদের পাশাপাশি ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনীতিকরাও মজুরি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।
যদিও মালিকপক্ষ অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসহ সব পণ্যের দাম বাড়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তারাও মনে করেন মজুরি বাড়ানো দরকার। তারপরও শ্রমিকদের দাবি হাস্যকর বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন তারা। বলছেন, শ্রমিকদের দাবি অনেকটা ‘বন্দুক চাইলে কামান পাবে’— এমন ধারণা। তাদের দাবি পূরণ তো দূরের কথা, সিপিডির ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর প্রস্তাব সম্পূর্ণ অযৌক্তিক— বলছেন বিজিএমইএ, বিকেএমইএ ও বিটিএমইএ নেতারা।
মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান মূল্যের সঙ্গে সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন হাজার টাকা বেতন বাড়তে পারে। তার চেয়ে বেশি বাড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু সিপিডির সাড়ে ১৭ হাজার টাকা এবং শ্রমিকদের দাবি করা ২৩ থেকে ২৫ হাজার টাকার মজুরি সম্পূর্ণ অবাস্তব। এ দাবি কোনোভাবে মানা সম্ভব নয়।
বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রমিকদের হাত ধরে বিশ্ববাজারে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। অথচ, সেই শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির দিক থেকে শীর্ষ দশের মধ্যে নেই বাংলাদেশ। আরও হতাশার বিষয় হচ্ছে, পাশের দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম বেতন পাচ্ছেন বাংলাদেশের শ্রমিকরা।
শ্রমিকরা বলছেন, পোশাক কারখানায় বর্তমানে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি আট হাজার টাকা। অথচ জিনিসপত্রের উচ্চ মূল্যের এ বাজারে একজন মানুষকে বেঁচে থাকতে ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা প্রয়োজন। এখন আট হাজার টাকা চলে যায় ঘর ভাড়ায়। এরপর খাবার এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য কিনতে হয় অতীতের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি ব্যয় হচ্ছে।
‘প্রত্যেক শ্রমিকের পরিবার আছে। অধিকাংশ শ্রমিকের পরিবার চলে একজনের আয়ে। পরিবার নিয়ে দুই বেলা ডাল-ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে ন্যূনতম ২৫ হাজার টাকা প্রয়োজন। তাই ২৫ হাজার টাকা মজুরি দাবি করা হয়েছে। দ্রুত এ দাবি না মানলে নির্বাচনের (জাতীয় সংসদ নির্বাচন) আগে আন্দোলনে নামব’— হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন শ্রমিকনেতারা।
শ্রমিকপক্ষের প্রতিনিধি ও বাংলাদেশ জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগের সভাপতি সিরাজুল ইসলাম রনি বলেন, শ্রমিকদের পক্ষে ন্যূনতম মজুরি প্রস্তাব আগামী ২২ অক্টোবর বোর্ডের কাছে তুলে ধরা হবে। আমরা এবার বাজার পরিস্থিতি সঙ্গে সমন্বয় রেখে ২০ হাজারের বেশি মজুরি রাখার প্রস্তাব করব। পাশাপাশি প্রতি বছর ১০ শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাব করব। এ ছাড়া, বর্তমানে সাতটি গ্রেডে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করা হয়েছে। সাতটি গ্রেড থেকে দুটি গ্রেড বাদ দিয়ে পাঁচটি গ্রেডে মজুরি দেওয়ার প্রস্তাব করব।
মালিকদের পক্ষ থেকে ন্যূনতম মজুরির প্রস্তাব দেবে তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমাদের প্রস্তাবনা এখনও তৈরি করা হয়নি। তবে আশা করছি, আগামী সভার আগেই প্রস্তাবনা তৈরি করতে পারব।
ন্যূনতম কত টাকা রাখার প্রস্তাব রাখবেন— জবাবে তিনি বলেন, সেটি ২২ অক্টোবরই জানতে পারবেন। তবে, সিপিডি ও শ্রমিক সংগঠনগুলো মজুরি বৃদ্ধির যে প্রস্তাব করেছে তা অযৌক্তিক। তাদের প্রস্তাবটি হলো এরকম যে ‘কামান চাইলে বন্দুক তো পাব’। সবার আগে দেশ ও সেক্টর। সবমিলিয়ে যেটা ভালো হবে সেটাই করা হবে। ২০১৩ এবং ২০১৮ সালে যে হারে বেতন বেড়েছে এবারও সেই ধারাবাহিকতায় মজুরি বাড়ানো হবে।
মজুরি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দেখতে হবে সেক্টরের কতটুকু সক্ষমতা আছে। ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পর এখন নতুন করে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন যুদ্ধ শুরু হয়েছে। এ ইস্যুতে বিশ্ব দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে নতুন মজুরি বাড়ানো হবে বলে জানিয়েছেন সিদ্দিকুর রহমান।
২০১৮ সালে ন্যূনতম মজুরি ২৭০০ টাকা বাড়িয়ে নির্ধারণ করা হয় আট হাজার টাকা। ২০১৩ সালে যা ছিল পাঁচ হাজার ৩০০ টাকা।
নিটওয়্যার মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএ’র নির্বাহী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম বলেন, একজন মাস্টার্স পাস করে মাত্র ১৬ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন। পড়ালেখা না জানা একজন গ্রামের লোককে কেন ১৭ হাজার কিংবা ২৫ হাজার টাকা মজুরি দিতে হবে?
দেশের অর্থনীতি, শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের সমন্বয়ে আমরা নতুন মজুরির প্রস্তাব চেয়েছি। দুই পক্ষই আগামী সভায় প্রস্তাব জমা দেবেন বলে আশ্বাস দিয়েছে। আমি আশা করি, নতুন মজুরি-কাঠামো কার্যকর হবে ১ ডিসেম্বর। সেই কাঠামোতে শ্রমিকরা নতুন মজুরি হাতে পাবেন জানুয়ারিতে
নিম্নতম মজুরি বোর্ডের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী মোল্লা
তিনি বলেন, ‘গত পাঁচ বছরের মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশ হারে বেড়েছে। তাতে বেতন ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি করার প্রস্তাব করছি। সেই হিসাবে আট হাজারের সঙ্গে আরও ২৪০০ টাকা বেতন বৃদ্ধি করা যেতে পারে। কিন্তু তার বেশি হলে অনেক মালিককে কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে।’
নিম্নতম মজুরি বোর্ডের সচিব রাইসা আফরোজ বলেন, মালিক কিংবা শ্রমিকপক্ষ আগামী ২২ অক্টোবর সভায় তাদের প্রস্তাবনা দেবে। প্রস্তাবনাগুলো যাচাই-বাছাই ও গবেষণা করে একটি প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠাব। মন্ত্রণালয় সেই প্রস্তাব চূড়ান্ত করবে।